health tips in bengali

আমাদের প্রতিটি পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ‘চিনি’ অতি পরিচিত এক নাম। শিশুর মেধা বিকাশ এবং সুস্বাস্থ্য রক্ষায় চিনির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনি মানুষের শরীরের জন্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম করে তুলতে মিষ্টিজাত খাবার খাওয়া জরুরি। health tips in bengali

আজকে আমরা চিনি’র অজানা কিছু তথ্য সম্পর্কে জানব।

চিনির উৎপাদন ও ব্যবহার সারা বিশ্বেই থাকলেও ভারতবর্ষেই প্রথম চিনির আবিষ্কার ও ব্যবহার শুরু হয়। ভারতবর্ষে ইতিহাসের প্রায় শুরু থেকেই সেখানে আখের চাষ হত।

বর্তমান সভ্য সমাজে আমরা স্বাস্থ্য বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন রয়েছি। আমরা কম বেশি সবাই জানি মানব শরীরের জন্য চিনির কতটুকু প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষনা অনুযায়ী, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন ৩-৬ চামচ চিনি গ্রহণ করা প্রয়োজন রয়েছে।

মানুষের শরীরের জন্য চিনির রয়েছে অনেক উপকারিতা। যেমন:

১# চিনি খেলে দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি পায়

আমাদের শরীরে যখন চিনির ঘাটতি হয়, তখন ধীরে ধীরে শক্তি কমে যায়। আর চিনি খাওয়ার ফলে শরীরে তাৎক্ষনিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

২#চিনি ত্বকের টোন ঠিক রাখতে সাহায্য করে

চিনির মধ্যে রয়েছে গ্লাইকোলিক এসিড, যা ত্বকের টোনকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের দাগ দূর করতে এবং তৈলাক্ততার ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।

৩# চিনি নিম্ন রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে

চিনি নিম্ন রক্তচাপকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। নিম্ন রক্তচাপ হলে চিনির শরবত খেলে তাৎক্ষণিক উপকার পাওয়া যায়।

৪#কাটাছেঁড়ায় চিনির উপকার

আমাদের শরীরে যেকোনো কাটাছেঁড়ার ক্ষেত্রে চিনির দানা প্রলেপ হিসেবে লাগালে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কাজ করে এবং দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।

৫#চিনি বিষন্নতা দূর করতে সাহায্য করে

চিনি বিষন্নতা দূর করতেও সাহায্য করে।

আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন তারা মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি অনেক আসক্ত। অনেকে আছেন তারা মিষ্টি জাতীয় খাবার দেখলে তাদের জিবে জল আসে।আবার অনেকে আছেন তারা চকলেট জাতীয় খাবার খেতে শুরু করলে আর থামতে চান না, একটার পর একটা খেতে থাকেন।তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে চিনি এক ধরনের আসক্তি।

যা খেলে আমাদের শরীরের জন্য উপকারের তুলনায় অপকারই বেশি হয় তা এড়িয়ে চলাই সব চেয়ে বেশি উত্তম।

এ নিয়ে সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা দিচ্ছেন নানা মজার এবং অজানা তথ্য। আসুন তাহলে জেনে নেই চিনি খাওয়ার অপকারী দিক গুলো।

প্রাগৈতিহাসিককালে তখন চিনি ছিল না, চিনির পরিবর্তে ছিল মধু আর মিষ্টি জাতীয় ফল। ওগুলো ধাপে ধাপে ভেঙে শরীরের রক্তে মিশত। প্রক্রিয়াজাত চিনি তা নয়, এগুলো সরাসরি রক্তে মেশে আর অতি দ্রুত মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায় এর প্রভাব।

বর্তমানে দেখা যায় মিষ্টান্ন ঘনীভূত চিনি বা হাই ফ্রুকটোজ সিরাপ ওগুলো আরও নেশা উদ্রেককারী।

স্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, চিনি আমাদের স্বাদগ্রন্থিকে পুরোপুরি তৃপ্ত হওয়ার সংকেত দিতে পারে না, যেমনটা পারে লবণ। যেমন লবণ জাতীয় খাবার একটু খাওয়া হয়ে গেলে আপনার স্বাদগ্রন্থি জানান দেবে যে যথেষ্ট হয়ে গেছে, আর খাওয়া যাবে না। চিনিযুক্ত খাবারের বেলায় মূলত তা হয় না। এর ফলে আপনি একসঙ্গে অনেকগুলো চকলেট খেয়ে ফেলতে পারেন বা এক প্যাকেট মিষ্টি খাওয়ার পরও আপনার আরও মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করতে পারে। আমেরিকান হার্ট ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, রিফাইন্ড চিনি বা সাদা চিনি খেলে বার বার চিনি খাবার ইচ্ছে জাগিয়ে তোলে, আর না খেলে শারীরিক বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যা মূলত নেশাদ্রব্যের বিশেষত্ব। health tips in bengali

যারা বেশি চিনি প্রিয় তারা চিনি ছেড়ে দিতে চেষ্টা করলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের অভাব দেখা দেয়। ফলে তাঁরা বিষণ্ন, বদমেজাজি, খিটখিটে হয়ে পড়েন, ছোট শিশুরা কখনো কখনো অতিচঞ্চল হয়ে ওঠে।

এখন কথা হলো, চিনি কি আসলেই খারাপ?

আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাদা চিনির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্লেখ করছি যা জানা আমাদের জন্য খুবই জরুরী।

১#লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়

চিনির গ্লুকোজ শরীর শোষণ করে নেয়। পরিশোধিত চিনিতে ফ্রুকটোজ এর পরিমান বেশি থাকে। ফ্রুকটোজকে একমাত্র পরিশোধিত করতে পারে লিভার। এই ফ্রুকটোজ লিভারে গিয়ে চর্বিতে পরিণত হয়। যার ফলে লিভার মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২#খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায়-

বেশি পরিমান চিনি খেলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে যায়। আর ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ ক্রমাগত কমে যায়।

৩#উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়-

বেশি পরিমান চিনি গ্রহণ শরীরের উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৭৩ অথবা ৭৪ গ্রাম বা তার থেকে বেশি পরিমাণে চিনি খেলে দেহের উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। health tips in bengali

৪#ওজন বাড়িয়ে দেয় যা মূলত ডায়াবেটিস এর কারণ-

চিনি আমাদের শরীরের ওজন বাড়িয়ে দেয়। তাই যাদের ওজন বেশি, তাদের চিনি খাওয়া এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো। চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেড়ে যায়।

৫#কিডনির জন্য ক্ষতিকর

বিশেষজ্ঞরা জানান, বেশি পরিমাণ চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলে কিডনির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে কয়েক বছরের মধ্যে  কিডনিকে দুর্বল করে ফেলে এবং এর কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করতে পারে।

কার্বোহাইড্রেট জাতীয় এই খাদ্য উপাদান কে অনেক বিশেষজ্ঞ নীরব হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আমরা বর্তমানে বাজারে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব চিনির বিকল্প হিসেবে কিছু ট্যাবলেট বা বিকল্প উপাদানও পাওয়া যায়। তবে চিনির বিকল্প হিসেবে রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি এসকল কৃত্রিম মিষ্টি ট্যাবলেটও যে একেবারে স্বাস্থ্যসম্মত, তা কিন্তু নয়। তাই যারা মিষ্টি বেশি পছন্দ করেন তারা চিনির পরিবর্তে মিষ্টিজাতীয় কিছু প্রাকৃতিক উপাদান খেতে পারেন যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। যেমন:

#আখের গুড়

আখ থেকে তৈরি চিনি আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হলেও আখের গুড় কিন্তু চিনির উত্তম বিকল্প হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, চা অথবা কফির সঙ্গে এক টুকরো গুড় আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী এবং এটি আপনার রক্ত সঞ্চালনকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

#মধু

মিষ্টির অভাব পূরণে চিনির বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে উত্তম ধরা হয় মধুকে। এক কাপ চা অথবা কফিতে এক চা চামচ সাদা চিনির চেয়ে এক চা চামচ মধু অনেক উপকারী। এটি আপনার শরীরের ওজন কমাতেও সাহায্য করবে।

#কিশমিশ

শুকনো আঙুর বা কিশমিশও চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত কিশমিশ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক।

#খেজুর

ফল হিসেবে খেজুর খুবই স্বাস্থ্যকর এবং এটি ডায়াবেটিস বা অন্য কোন রোগের ক্ষেত্রে মোটেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেনা বরং স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। তাই চিনির বিকল্প হিসেবে খেজুরকে শুকিয়ে গুঁড়ো করে অথবা সিরাপ তৈরি করে যে কোনো খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে পারেন।

#নারিকেল

চিনির বিকল্প হিসেবে নারিকেল বা নারিকেলের গুঁড়া এখনো বেশ প্রচলিত রয়েছে। এটিও আমাদের জন্য বেশ স্বাস্থ্যকর একটি খাবার।

#স্টেভিয়া

চিনির বিকল্প হিসেবে বর্তমানে আবিষ্কৃত সব থেকে কার্যকর প্রাকৃতিক উপাদান হচ্ছে ‘স্টেভিয়া’ নামে এক ধরনের সবুজ উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদটি মূলত চিনির থেকে প্রায় ২৫০-৩০০ গুণ বেশি মিষ্টি। আবার এতে কোন ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেড না থাকায় এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। ফলে ডায়াবেটিস রোগীরাও নিশ্চিন্তে এটা দিয়ে তৈরী খাবার খেতে পারবেন যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

#ফলের রস

আম, ডালিম, কলা, স্ট্রবেরি, তরমুজ, মিষ্টি আপেল, কাঁঠাল, পেঁপে ও আনারসে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক চিনি। খাবারের সঙ্গে মিষ্টান্ন হিসেবে এসব ফলের জুস খেতে পারেন। এছাড়াও যে কোনো মিষ্টি খাবার প্রস্তুতের জন্যও এগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

অতিরিক্ত চিনি খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়ায়। দেখা যায় অনেকে আবার আখের চিনির বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম চিনি যেমন- সোডিয়াম সাইক্লামেন্ট, স্যাকারিন,  ম্যাগনেসিয়াম, সালফেট ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। এগুলো খেয়ে বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা প্রায়ই বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

আমদানিকৃত মিহিদানার পরিশোধিত চিনির ক্ষতিকর বিষয়ে ভোক্তা সাধারণ জ্ঞাত নন বলে সাদা ঝকঝকে পরিশোধিত চিনির প্রতি বেশি ঝুঁকছেন।

খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট তাদের গবেষণায় বলেছে,  আখের চিনিতে ক্যালসিয়াম প্রতি ১০০ কিলোগ্রামে ১৬০.৩২ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ১.৫৬ থেকে ২.৬৫ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম আখের চিনিতে ০.০৬ থেকে ০.০৭ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ০.০২ থেকে ০.০৩ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম আখের চিনিতে ১৪২.০৯ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ০.৩২ থেকে ০.৩৫ মিলিগ্রাম, ফসফরাস আখের চিনিতে ২.০৫ থেকে ১০.৭৯ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ২.৩৬ থেকে ২.৩৫ মিলিগ্রাম, আয়রণ আখের চিনিতে ০.৪২ থেকে ৬ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ০.৪৭ থেকে ০.৮২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম আখের চিনিতে ০.১৫ থেকে ৩.৮৬ মিলিগ্রাম আর আমদানিকৃত চিনিতে ০.৬৬ থেকে ১.২১ মিলিগ্রাম। health tips in bengali

পরিশেষে একটি কথা না বললেই নয়। পরিশোধিত সাদা চিনির চেয়ে লালচে চিনির ক্ষতি খুবই কম, কিন্তু আমাদের শরীরের জন্য সবচেয়ে ভাল খুব কম চিনি গ্রহণ করা এবং ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকা থেকে এটি বাদ দেয়া।

স্বাস্থ্যই সম্পদ- সুস্থদেহ, মনকে প্রফুল্ল রাখে। কাজ কর্মে এনে দেয় মনোযোগ ও প্রশান্তি।

মহান আল্লাহর সৃষ্টির এক সুনিপুণ সৌন্দর্য্য আমাদের এই শরীর, আর আমাদের একটু অবহেলায়ই সুন্দর এই শরীর ঝরে পড়তে পারে।

তাই কোন অবহেলা নয়, কেননা স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। এই বিশ্বাস কে ধারণ করে আসুন নিজে এবং পরিবারকে সুস্থ রাখি।

About the author : Mannan570

Leave A Comment