হার্ট অ্যাটাক

ভূমিকাঃ আমরা সবাই সুস্থ্য সুন্দর জীবন চাই।দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা মানুষের চিরন্তন। কিন্তু আসলেই কি আমরা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারব? আমরা যেহেতু মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহন করেছি তাহলে একদিন অবশ্যই আমাদেরকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। জীবন চলার পথে কিছু অনিয়মের কারণে অনেকে হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক বিশ্বের এক নম্বর মরণব্যাধি যা কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই যে কোন সময় কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। সমগ্রবিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি লোক মৃত্যুবরণ করে মরণব্যাধি এই হৃদরোগের কারণে। সুন্দর সুস্থ্য জীবনের জন্য সুস্থ্য হার্টের কোনো বিকল্প নেই।

হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক কেন হয়?

হৃদপিন্ড বুকের মাঝখানে ও বাঁ পাশের কিছু অংশজুড়ে থাকে। হৃদপিন্ড সাধারনত সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালনের কাজ করে থাকে। হৃদপিন্ড মানবদেহের মধ্যে এমন এক অঙ্গ, যা সারাক্ষণ ধরে কাজ করে থাকে, এক সেকেন্ড এর জন্যও বিশ্রাম নেয় না। হৃদপিন্ডে যে রক্ত প্রবাহিত হয় তা আসে ধমনী দিয়ে। ধমনী যখন সরু হয়ে যায়, তখন নালীর ভেতরে রক্ত জমাট বেধে যেতে পারে। এর ফলে নালীর ভেতর দিয়ে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যার কারণে হৃদযন্ত্রের পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সে আর অক্সিজেন প্রবাহিত করতে পারে না। হৃদপিন্ডের ভেতর দিয়ে অক্সিজেন প্রবাহিত হতে না পারলেই হার্ট অ্যাটাক হয়।

হার্ট অ্যাটাক কিভাবে হয়ঃ সারাক্ষণ ধরে কাজ করার জন্য হার্ট এর প্রয়োজন হয় অক্সিজেন ও পুষ্টি। অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করার জন্য হার্টের রয়েছে মূলত তিনটি রক্তনালী। এই তিনটি রক্তনালী ও তাদের শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে হার্টের মাংসপেশিতে রক্ত সরবরাহ করে থাকে। এই তিনটি রক্তনালীর মধ্যে যেকোনো একটি যদি সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হার্ট অ্যাটাক হয়। অনেকের শরীরে বিভিন্ন রক্তনালীতে চর্বি জমার কারণে রক্তনালী সরু হতে থাকে। যার ফলে বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমতে থাকে এবং হার্ট অ্যাটাক হয়।

হার্ট অ্যাটাকের কারণঃ সাধারনত যেসকল কারনে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে সেগুলো নিম্নরুপঃ

হার্ট অ্যাটাক সাধারনত মধ্যবয়সে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে এ রোগটি বেশি হতে পারে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এর কারণে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই নিয়মিত বিশ্রাম, সময় মতো ঘুমানো গভীর রাত পর্যন্ত জেগে না থাকা এবং শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগের কারনে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

ধুমপান, মদ্যপান ইত্যাদি নেশার কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি অনেক বেড়ে যায়। বেশি এ্যালকোহল গ্রহণ মানে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়া।

মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজের পর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অধিক হারে চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহন করলে এবং শাক সবজি ও আঁশ জাতীয় খাবার কম খেলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই কম চর্বি ও কম কোলেষ্টেরল যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।

শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণে মুটিয়ে যাওয়া বা স্থূলতা হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম একটি কারন।

এই আর্টিকেলটি ভিডিও আকারে দেখতে চাইলে ভিডিও এর প্লে আইকোনে ক্লিক করুন

হার্ট সুস্থ্য রাখতে আমাদের করনীয়ঃ হার্টের অসুখ এমন একটা রোগ যা আগে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই। তবে সচেতনতা এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে এই রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক হার্ট সুস্থ্য রাখতে কী করবেন এবং কী খাবেন-

  • মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।
  • সুস্বাস্থ্য ও সবল হৃদযন্ত্রের জন্য যাবতীয় প্রকার নেশা পরিহার করতে হবে।
  • নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রন করতে হবে।
  • নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরে ওজন বেড়ে যেতে পারে। তাই শরীরের ওজন কমানোর জন্য নিয়মিতভাবে প্রতিদিন হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা কোন শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার কারণে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যার ফলে অধিক ওজন সম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
  • অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং রক্তে কোলেস্টোরলের মাত্রা কমাতে হবে।
  • অতিরিক্ত লবণ না খাওয়া, তেল বা চর্বি এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার কম খাওয়া, শাক সবজি ও ফলমূল বেশি করে খাওয়ার মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
  • তৈলাক্ত মাছে ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এটি হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ কার্যকরী।
  • শরীরের কোলেস্টেরল দূর করতে রসুনের ভূমিকা অপরিসীম। সকালে খালি পেটে এক কোয়া রসুন হার্টের পক্ষে দারুণ উপকারী।
  • কাঁচা হলুদের উপকারিতার কথা আমরা সবাই জানি। এটি হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। তাই হার্ট ভালো রাখতে সুস্থ্য রাখতে নিয়মিত কাঁচা হলুদ খান।
  • উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কলার ভূমিকা অপরিসীম। কলাতে প্রচুর পরিমান পটাশিয়াম থাকে। তাই নিয়মিত কলা খান।
  • ওটস বেশ স্বাস্থ্যকর একটি খাবার। এতে হাই ফাইবার থাকে। এটি হার্টকে সুস্থ্য রাখতে এবং কোলেস্টেরল কমাতে খুবই সহায়ক।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সমূহঃ

  • শ্বাসকষ্ট বা নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা।
  • বুক ভারী ভারী লাগা, যন্ত্রণা হওয়া এবং বুকে চাপ অনুভূত হওয়া।
  • মাথা ব্যথা করা, বমি হতে পারে বা বমি বমি ভাব হওয়া।
  • হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলে রোগীর বুকের বাম পাশে বা মাঝখানে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
  • চোখে অন্ধকার দেখা বা ঝাপসা দেখা, মাথা  ঝিমঝিম করা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।
  • পেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া করতে পারে।
  • প্রচুর পরিমানে ঘাম হতে পারে, অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করা এবং রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক হলে যা করতে হবেঃ

  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
  • আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে নিজে পায়ে হেঁটে কিংবা গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে না যান সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পর্যাপ্ত পরিমানে আলো বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গায়ের জামা-কাপড় ঢিলেঢালা করে দিতে হবে ।
  • হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে, হার্টের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে এরকম হাসপাতালে নিতে হবে। অতঃপর হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহন নিশ্চিত করতে হবে।
  • রোগীর সঙ্গী হিসাবে কমপক্ষে দুইজন হাসপাতালে রোগীর সাথে যাবেন।

পরিশেষে, হার্ট বা হৃদপিণ্ড মানব দেহের জন্য একটি জরুরী অঙ্গ। মানব দেহের অন্য যেকোনো অঙ্গ অকেজো হয়ে গেলে শুধু ওই অঙ্গের কার্যের ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু হার্ট বা হৃদপিণ্ড নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ মারা যায়। তাই হার্ট সুস্থ্য থাকলে একজন মানুষ ভালো বা সুস্থ্য থাকবে। তাই নিজেকে সুস্থ্য রাখতে চাইলে হার্টকে সুস্থ্য রাখতে হবে। তাই জীবনযাপনে পরিবর্তন আনুন, হার্টের সু-স্বাস্থ্যের জন্য যা ক্ষতিকর তা পরিত্যাগ করার মাধ্যমে সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকতে হবে। আশা করি আর্টিকেলটি সকলের ভালো লেগেছে। ভালো লাগলে অবশ্যই আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন।

About the author : Mannan570

Leave A Comment