হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদিগকে এমন একটি জাতিরুপে গঠন করিয়া গিয়াছেন এবং এমন একটি ধর্ম তথা আদর্শ জীবন ব্যবস্থা দান করিয়া গিয়াছেন যাহা সর্বদিক দিয়া স্বয়ংসম্পূর্ণ। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের হেদায়াতের জন্য কোরআন নাজিল করেছেন যাতে মানুষ সঠিক জ্ঞান অর্জন করিয়া দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যান লাভ করিতে পারে।

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে মানুষের রয়েছে বিবেক, বুদ্ধি, ভাল মন্দ বুঝার জ্ঞান। অর্থাৎ কোন কাজ করিলে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি পাওয়া সম্ভব আর কোন কাজে অকল্যানকর তাহা বুঝার মত যথেষ্ট মেধা শক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের দান করিয়াছেন। হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর তরফ হইতে আনিয়া আমাদিগকে এমন কতগুলি সাধারন সূত্র এবং মাপকাঠি শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন, সেই শিক্ষার আলোকে কোনটি আমাদের জন্য গ্রহনযোগ্য এবং কোনটি গ্রহনের অযোগ্য তাহা বাছাই করিয়া দেখিতে পারি।  কাজেই যে সমস্ত প্রথা সে সময় ছিল না কিন্তু বর্তমান সময়ে চালু রয়েছে, ইহাদিগকে সেই মাপকাঠি দ্বারা মাপিয়া গ্রহন বা বর্জন করিতে হইবে।

আল্লাহ বা আল্লাহর রাসুল যে সমস্ত কার্যকে ‘করো’ বলিয়া স্পষ্টভাবে আদেশ করিয়াছেন সেই সমস্ত কার্যকে বলা হয় ফরজ এবং ওয়াজিব। আর যে সমস্ত কার্যকে করিওনা বলিয়া স্পষ্টভাবে নিষেধ করিয়াছেন সেই সমস্ত কাজকে বলা হয় হারাম। আল্লাহ এবং রাসুলের পছন্দ, অপছন্দ, আদেশ, নিষেধ অর্থাৎ কোন কাজে কল্যানকর, কোন কাজে অকল্যানকর, কোন কাজে জান্নাত, কোন কাজে জাহান্নাম, কোন কাজে শান্তি আর কোন কাজে অশান্তি তাহা জানার একমাত্র উপায় আল্লাহর কোরআন এবং রাসুলের হাদীস।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জ্বীন এবং মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। একজন মানুষ তার হায়াতের জীবন কিভাবে পরিচালনা করিবে অর্থাৎ তার পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন তার সমস্ত দিক নির্দেশনা রয়েছে কোরআন এবং হাদীসে। কোরআন এবং হাদীস থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের জীবন পরিচালনা করিতে পারি, তবেই আমাদের জীবনে কাঙ্খিত সুখ শান্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি করছি? আমরা কি বাস্তব জীবনে কোরআন হাদীস মেনে চলছি? মানছি না! তবে কোরআন হাদীস ছাড়া আমাদের জীবনে শান্তি পাওয়া সম্ভব? নিশ্চয় না। কেন নয়, কারণ আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তার হুকুম পালন করছি না। উদাহরন স্বরুপ আমরা একটা অফিসে চাকরি করি, কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন তাঁর কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য, বিনিময়ে মাস শেষে আমাদেরকে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকেন। যদি আমরা কাজ না করি তবে কি আমরা পারিশ্রমিকের আশা করিতে পারি, নিশ্চয় না। অনুরুপভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁর হুকুম, আদেশ, নিষেধ পালন করার জন্য অর্থাৎ যা আমাদের জন্য অবশ্য করনীয় তা পালন করিতে হইবে এবং যা নিষেধ করিয়াছেন তা বর্জন করিতে হইবে। তবেই ইহকাল এবং পরকালে শান্তি পাওয়া সম্ভব।  তবে আমরা মহান আল্লাহর হুকুম পালন করছি না কেন? তাহলে কি তা না করেই শান্তি পেতে চাই। তাতে কি শান্তি পাওয়া সম্ভব? নিশ্চয় না। উদাহরনস্বরুপ একটি মোটর সাইকেল কোম্পানী মোটর সাইকেল তৈরি করে তা বাজারজাত করনের সময় মোটর সাইকেলটি কিভাবে পরিচালনা করিতে হইবে তা ক্রেতাকে জানিয়ে দেয়া হয়। এখন আমরা যদি পেট্রোল এর জায়গায় কেরোসিন এবং মবিল এর জায়গায় পানি দেই তাহলে কি মোটর সাইকেলটি আমরা সঠিকভাবে পরিচালনা করিতে পারিব।  অনুরুপভাবে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করে (নর নারী) মানুষ তার হায়াতের জিন্দেগিতে কিভাবে নিজেকে পরিচালিত করিবে তার জন্য দিক নির্দেশনা স্বরুপ কোরআন এবং হাদীস মানুষের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন। একমাত্র কোরআন এবং হাদীসের শিক্ষা গ্রহন করেই মানুষ ইহকাল এবং পরকালে শান্তি পেতে পারে, নচেৎ নয়।

ইসলাম ধর্ম এই পৃথিবীতে আসার ফলে মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখিতে পায়।  ইসলামের শিক্ষা গ্রহন করে মানুষ যাতে সম্মান ও সুখ্যাতি বজায় রেখে ঈমানের সহিত ইহজগৎ পরজগৎ উভয় জগতকে সুন্দর করে গঠন করিতে পারে সেই সব মহাশিক্ষা আমরা কোরআন এবং হাদীস থেকে পেতে পারি। আল্লাহ আমাদের জন্য যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করিয়াছেন তেমনি পর্দা করাও ফরজ করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু বরই পরিতাপের বিষয় এই যে, একদল লোক পর্দা ফরজের সুনীতিকে মনে প্রানে মানতে নারাজ। তারা বেপর্দা অবস্থায় চলাফিরা করাকেই কল্যানকর বলে মনে করছে। অথচ কোরআন এবং হাদীসে পর্দার জন্য কত তাগিদ রয়েছে তা তাহারা বুঝিতে পারছে না।

‘স্ত্রী জাতি আপাদ মস্তক ঢাকিয়া রাখিবার বস্তু।  যখনই তাহারা বেপর্দায় বাহির হয় তখনই শয়তান তাহাদের পাছে উঁকি ঝুঁকিতে লাগিয়া যায়’-তিরমিযী।  বাস্তব জীবনে আমরা দেখিতে পাই যে, যে বস্তু যত বেশি মূল্যবান সে বস্তুটিকে তত গোপন জায়গায় সংরক্ষন করা হয়।  মধু বা অন্যান্য খাবার জিনিস ধুলাবালি ও মাছি থেকে রক্ষা করিতে তা আমরা ঢাকিয়া রাখি।  অনুরুপভাবে মহান আল্লাহ নারী জাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং নারী জাতি কিভাবে সুরক্ষিত থাকবে তার কল্যানের জন্য পর্দা ব্যবস্থাকে ফরজ করিয়া দিয়েছেন।  যারা আল্লাহর এই ফরজ হুকুমকে মনে প্রানে মেনে নেবেন তাদের জন্য রয়েছে ইহকাল এবং পরকালে অশেষ শান্তি।  সুরা আহযাব এর ৩৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন- নিঃসন্দেহে ইসলামের বিধান পালনকারী নর এবং ইসলামের বিধান মান্যকারিনী নারী এবং ঈমানদার নর ও ঈমানদার নারী, আনুগত্য প্রদর্শনকারী নর ও আনুগত্য প্রদর্শনকারিনী নারী, সত্য পরায়ন নর ও সত্য পরায়না নারী, ধৈর্যশীল নর ও ধৈর্যশীলা নারী, বিনয়ী নর এবং বিনীতা নারী, দানশীল নর ও দানশীলা নারী, রোযাদার নর ও রোযাদার নারী, স্বীয় লজ্জা স্থানের হেফাযতকারী নর ও স্বীয় লজ্জা স্থানের হেফাযতকারিনী নারী, আর আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নর ও অধিক পরিমানে স্মরণকারিনী নারী এ সমস্ত লোকের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও বিরাট বিনিময় প্রস্তুত রাখিয়াছেন।

একদা হযরত নবী করীম (সাঃ) বাড়ির ভিতর বসিয়া ছিলেন। তাঁহার কাছে তাঁহার দুই বিবি হযরত উম্মে সালমা এবং হযরত মায়মুনা (রাঃ) আনহুমা ছিলেন। এমন সময় আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম নামক একজন অন্ধ ছাহাবী হযরতের কাছে আসিতে চাহিলেন। হযরত তাহার বিবিদ্বয়কে তৎক্ষনাৎ হুকুম করিলেনঃ ‘তোমরা পর্দা কর’। তাহারা আরয করিলেন হুযুর ‘ইনি তো অন্ধ, ইনি তো আর আমাদের দেখিবেন না তাঁহা হইতে পর্দা করার দরকার কি? হযরত বলিলেন, ‘তোমরাও কি অন্ধ’ তোমরাও কি তাহাকে দেখিবে না?’

ইসলাম প্রিয় ভাই ও বোনেরা, চিন্তা করুন। একদিকে নবী পত্নী মুসলীম জননী, আর একদিকে অতি পরহেযগার সাধু চরিত্র নবী, আর এমন পবিত্র স্থানেও কি অন্ধ ছাহাবীর কোনরুপ কু-ধারনার আশঙ্কা ছিল? তাহা সত্ত্বেও হযরত স্বীয় উম্মতকে ইসলামী সুশিক্ষা দিবার জন্য আল্লাহর আইনের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজের ঘরে আমল শুরু করে কিরুপে স্ত্রীলোকদের পর্দা করার হুকুম দিয়েছেন।

কোরআন শরীফের সুরা আহযাব এর একটি আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘হে নবী আপনি আপনার বিবিগনকে এবং আপনার কন্যাগনকে এবং অন্যান্য মুসলমান নারী গনকে বলিয়া দিন যে, কোন প্রয়োজনবশত যখন তাহাদের বাহিরে যাওয়ার দরকার পড়ে, তখনও যেন তাহারা পর্দার ফরজ লঙ্ঘন না করে।  এমনকি, চেহারাও যেন খোলা না রাখে।  তাহারা যেন বড় চাদরের ঘোমটা দ্বারা তাহাদের চেহারাকে আবৃত করিয়া রাখে।

এই সমস্ত হাদীস এবং কোরআনের আয়াত দ্বারা পরিষ্কার বুঝে আসে যে, পর্দা প্রথা পালন করা কত জরুরী। কিন্তু বর্তমানে আমরা কোরআন হাদীস থেকে দুরে সরে গিয়ে কোরআন হাদীস যা বলছে তা না মেনে ঠিক উল্টো কাজটিই আমরা করছি। যার ফলশ্রুতিতে যতই দিন যাচ্ছে ততই আমাদের সমাজে যেনা, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ, যৌতুক, নেশা ইত্যাদি অন্যায় কাজে সমাজ ছেয়ে গেছে। এর পিছনে একটাই কারণ আমরা কোরআন হাদীস থেকে দুরে সরে গেছি। যার ফলশ্রুতিতে সমাজে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমরা শান্তি খুজছি, কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, কোরআন ও হাদীস ব্যতিত আমরা ইহকাল এবং পরকালে শান্তির আশা করিতে পারি না। আমরা শিক্ষিত সমাজ, ভাল মন্দ বোঝার জন্য মহান আল্লাহ আমাদের যথেষ্ট বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান দিয়েছেন।  বাবা মা আমাদেরকে পড়ালেখা শিখিয়ে শিক্ষিত করে তুলেছেন। আমরা শিক্ষা গ্রহন করে অনেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবি ইত্যাদি বড় বড় পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছি।  আমরা শিক্ষা গ্রহন করছি ঠিকই কিন্তু শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য সেই উদ্দেশ্য থেকে আমরা বহুগুনে পিছিয়ে রয়েছি। অর্থাৎ শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য ভাল এবং মন্দ, সৎ এবং অসৎ, ন্যায় এবং অন্যায়, হালাল এবং হারাম ইত্যাদি থেকে যেটা আমার নিজের, পরিবারের, সমাজের এবং দেশের জন্য কল্যানকর সেটা গ্রহন করিতে হইবে এবং যা অকল্যানকর তা থেকে বিরত থাকিতে হইবে।  তবেই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হইবে। সমাজে প্রবাহিত হবে শান্তির সুশীতল বাতাস। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না কেন? এর পিছনে একটাই কারণ আমরা শিক্ষা গ্রহন করছি ঠিকই কিন্তু সুশিক্ষা গ্রহন করে তা বাস্তবে রুপ দিচ্ছি না। অর্থাৎ যা শিখছি তার বিপরীত কাজটিই আমরা করছি। অর্থাৎ আমরা শিখছি প্রতিটি মুসলমান নর এবং নারীর প্রতি নামাজ, রোজা ফরজ, পর্দা করা ফরজ, সুদ ঘুষ হারাম, নেশা করা হারাম, যৌতুক নেয়া হারাম। আমরা শিখছি ঠিকই কিন্তু বাস্তবে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি না। আমরা জানি নেশা করা হারাম, ধুমপানে বিষপান, ধুমপান করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু জানার পরেও আমরা ধুমপান করছি। যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমরা ভাল এবং মন্দ থেকে ভাল জিনিসটাকে গ্রহন করতে পারলাম না, সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে লাভ কি বলুন?

পরিশেষে আমরা যদি ইহকাল এবং পরকালে শান্তিতে থাকতে চাই, তবে মহান আল্লাহর কোরআন এবং রাসুলের হাদীসের অনুসরন অনুকরন এর মাধ্যমে আমরা যদি মনে প্রানে তা মেনে নিতে পারি তবেই আমরা ইহকাল এবং পরকালে শান্তিতে থাকতে পারব।  আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুক।  মহান আল্লাহ যেন কোরআন এবং হাদীসের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করে দেন, জাহান্নামের পথ থেকে জান্নাতের পথ সুগম করেন।  আল্লাহ আমাদের কবুল করুন-আমিন।

পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার অপশন থেকে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন এবং কমেন্ট বক্সে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করবেন। আর নিয়মিত পড়তে থাকুন আপনার প্রিয় ব্লগ সাইট www.healthnbeautyblog.com এ প্রকাশিত আর্টিকেলগুলি।

About the author : Mannan570

Leave A Comment