ব্লগ লিখুন, আয় করুন

বর্তমান যত দিন যাচ্ছে দেশে বেকারের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে ততই বেড়ে চলছে।  অনেকের মেধা আছে, শক্তি আছে কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে ভাল কিছু করতে পারছে না।  আবার অনেকে বেকারের অভিশাপ থেকে মুক্তির আশায় জমিজমা বিক্রি করে দালালের খপ্পরে পড়ে ছুটছে সরকারী চাকুরির আশায়।  কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি, চাকুরি তো হলই না বরং জমিজমা বিক্রি করে সর্বশ্রান্ত হয়ে সে এখন পথের ফকির।  আমরা অনেকে সরকারী চাকুরিকে একমাত্র আয়ের উৎস মনে করি।  আসলে আমরা অনেকেই জানিনা যে অনলাইনে খুবই সামান্য পুজিতে শুধু মাত্র লেখালেখি করে হাজার হাজার টাকা ইনকাম করা সম্ভব।  আমাদের অনেকের মেধা শক্তি আছে, সৃজনশীলতা আছে আমরা ইচ্ছা করলে মেধাকে কাজে লাগিয়ে ভাল কিছু লেখার মাধ্যমে অন্যের উপকার করার পাশাপাশি আয়ের পথও প্রশস্ত করতে পারি।

ব্লগিং কি?

কোন বিষয়ে কাজ শুরু করার আগে আমাদেরকে ঐ বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারনা রাখা আবশ্যক। অনুরুপভাবে ব্লগিং শুরু করার আগে ব্লগিং কি তা আমাদেরকে জানতে হবে। ব্লগিং হচ্ছে বিভিন্ন ব্লগ সাইট বা ওয়েব সাইটে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করা। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্লগিং হতে পারে যেমন: রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ধর্ম, টেকনোলজি, খেলাধুলা, সাহিত্য ইত্যাদি। মোট কথা আপনি যে বিষয়ে দক্ষ, যে বিষয়ে আপনার পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে সে বিষয়ে আপনি লিখতে পারেন। আর যারা ব্লগিং করে বা বিভিন্ন ব্লগ সাইট বা ওয়েব সাইটে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করে তাদেরকে বলা হয় ব্লগার।

ব্লগিং করে কি লাভবান হওয়া যায়?

ব্লগিং পেশায় যারা নতুন বা যারা ব্লগিং করবেন বলে ভাবছেন তারা হয়তো বলতে পারেন ব্লগিং করে কি লাভবান হওয়া যায় বা ব্লগিং করে কি ইনকাম করা যায়।আপনি যদি একজন ভাল মানের লেখক হন তাহলে অবশ্যই আপনি ব্লগিং করে ইনকাম করতে পারবেন।  তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, আপনি বাংলায় ব্লগিং করবেন, না ইংরেজীতে। আপনি যদি বাংলায় ব্লগিং করেন সেক্ষেত্রে তুলনামুলকভাবে লাভ একটু কম হবে।  আর আপনি যদি ইংরেজীতে ব্লগিং করেন তাহলে প্রচুর টাকা আয় করতে পারবেন।তবে ইংরেজীতে ব্লগিং করতে চাইলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য আপনার যথেষ্ট অভিজ্ঞতার দরকার হবে কারণ বর্তমানে হাজার হাজার ইংরেজী ব্লগ সাইট আছে অনলাইনে।

কিভাবে ব্লগ সাইট তৈরি করবেনঃ

আপনার লেখা প্রকাশের জন্য একটি প্লাটফর্ম এর দরকার হবে আর তার জন্য আপনি ওয়ার্ডপ্রেস কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বেছে নিতে পারেন। তবে তার আগে আপনাকে ডোমেন, হোস্টিং এবং থিম কিনে নিতে হবে। তার জন্য আপনার খরচ হবে ৫-৬ হাজার টাকা। তবে আপনি চাইলে ব্লগার ডট কম বা ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম দিয়ে বিনা খরচে ব্লগ সাইট তৈরি করতে পারেন। তবে ফ্রি ব্লগ সাইট গুলোতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় ডোমেন, হোস্টিং এবং থিম কিনে ব্লগ সাইট তৈরি করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বিষয় বা নিশ নির্বাচন করাঃ

ব্লগিং শুরু করার আগে নিশ বাছাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা নতুন তাদের জন্য নিশ নির্বাচন করা অনেক জটিল বিষয়। অনেকের মেধা আছে কিন্তু শুরু করবে কোন বিষয় নিয়ে তা নির্বাচন করতে করতে অনেক সময় পেড়িয়ে যায়। অনলাইনে প্রায় সকল ধরনের নিশ নিয়ে হাজার হাজার ব্লগ রয়েছে। নতুন হিসেবে আপনি কতটা সফল হতে পারবেন তা মূলত নির্ভর করবে আপনার সৃজনশীলতা এবং কন্টেন্ট এর বিষয়বস্তুর উপর। তাই আপনি কোন বিষয়ে দক্ষ সেই ধরনের নিশ নিয়ে আজই লেখা শুরু করতে পারেন। সেটা যে কোন বিষয় নিয়ে হতে পারে যেমন: হেলথ রিলেটেড, কম্পিউটার রিলেটেড, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদি।

ব্লগ থেকে যেভাবে টাকা ইনকাম করবেনঃ

আপনার ব্লগ সাইট প্রস্তুত হয়ে গেলে আপনি নিয়মিত লেখার মান বজায় রেখে আর্টিকেল পাবলিশ করতে থাকুন। আপনি এখন চাইলে আপনার ব্লগ থেকে টাকা ইনকামের কথা চিন্তা করতে পারেন। ব্লগ থেকে টাকা আয়ের বেশ কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে। আমরা এখন ধারাবাহিকভাবে সবকিছু বিস্তারিত ভাবে জানব।

গুগল অ্যাডসেন্স থেকে আয়ঃ

ব্লগিং করে আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে গুগল অ্যাডসেন্স থেকে আয়। এর জন্য প্রথমে আপনাকে গুগলে অ্যাডসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। আপনার আবেদন যদি অনুমোদন পায় তাহলে গুগলের নির্দিষ্ট রুলস অনুসরন করে বিজ্ঞাপন কোডটি আপনার ব্লগ সাইটের সাইট বার, লেখার মাঝখানে বা পেজের হিডারে সংযুক্ত করতে হবে। আপনি যদি সফলভাবে বিজ্ঞাপন কোডটি আপনার সাইটে সংযুক্ত করতে পারেন তাহলে আপনার ব্লগ পোস্টে বিজ্ঞাপন চলে আসবে। প্রতিটি বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক বিভিন্ন উপায়ে টাকা প্রদান করে থাকে।যেমনঃ কতজন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলো বা কতজন ভিউ করলো ইত্যাদি।

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে আয়ঃ

বর্তমানে ব্লগ থেকে আয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে আয়। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শুরু করার আগে আপনাকে প্রথমে অবশ্যই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং হল কোন একটি কোম্পানীর পণ্য কমিশনের বিনিময়ে বিক্রি করিয়ে দেয়া। মনে করুন ওয়ালটন কোম্পানী তাদের ফ্রিজ বা এসি বিক্রি করার জন্য আপনাকে বলল তুমি আমার প্রডাক্ট বিক্রি করে দেও আমি তোমাকে ১৫% বা ২০% কমিশন দিব। আপনি যখন তার প্রস্তাবে সম্মত হবেন তখন কোম্পানী তার প্রডাক্টের একটি লিংক আপনার সাথে শেয়ার করবেন। এখন আপনার কাজ হল ঐ লিংকটিকে প্রমোট করা। প্রমোট করার ফলে যতগুলো ক্রেতা ঐ লিংকে ক্লিক করে প্রডাক্ট ক্রয় করলে কোম্পানীর সাথে চুক্তি অনুযায়ী আপনার একাউন্টে কমিশন জমা হতে থাকবে।  মূলত এই হচ্ছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং।এখন প্রশ্ন করতে পারেন ব্লগিং এর সাথে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর সম্পর্ক কি? আপনি অনেক সময় হাট বাজারে লক্ষ্য করবেন সাপুড়ে সাপ খেলা দেখায় এবং সাপ খেলার মাঝখানে তাবিজ বা যে কোন প্রডাক্টের অফার করে।  মূলত সাপ খেলা দেখা এটা হচ্ছে একটা ব্যবসায়ীক কৌশল। আপনাকে প্রথমেই যদি তাবিজের অফার করে তাহলে কিন্তু আপনি আকৃষ্ট হবেন না। আপনাকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রথমে সাপ খেলা দেখানো এবং মাঝখানে তাবিজের অফার। এখন আপনি যেহেতু ওয়ালটন কোম্পানীর ফ্রিজ বা এসি বিক্রি করবেন তাহলে আপনাকে যা করতে হবে ফ্রিজ বা এসি’র ভাল মন্দ, এর উপকারীতা, অপকারিতা, বাজারে কোন এসি বা ফ্রিজ ভাল এর সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে ৫০০ বা ১০০০ ওয়ার্ড এর মধ্যে একটি ব্লগ লিখবেন এবং এর মাঝখানে আপনার প্রডাক্টের অফার করলেন। আপনি এই পদ্ধতিতে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর জন্য ব্লগ লিখে আয় করতে পারেন। কয়েকটি প্রচলিত অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক হল Clickbank, ebay এছাড়াও অ্যামাজনের মতো কোম্পানিতে অ্যাফিলিয়েট হিসেবে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও বর্তমানে কিছু কিছু জনপ্রিয় ই-কমার্স ওয়েবসাইটগুলির অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম চালু রয়েছে এদের মধ্যে দারাজ ডট কম অন্যতম।

স্পন্সর অ্যাড এর মাধ্যমে আয়ঃ

আপনার ব্লগ সাইটটি যদি মান সম্মত হয় এবং আপনার ব্লগ সাইটে যদি হাজার হাজার ভিজিটর থাকে তাহলে আপনি দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আপনার ব্লগ সাইটে সংযুক্ত করে আয় করতে পারেন।

নিজস্ব সার্ভিস বিক্রি করে আয়ঃ

মনে করুন আপনি একজন প্রফেশনাল ওয়েব ডিজাইনার বা গ্রাফিক্স ডিজাইনার বা ইউটিউবার বা এসইও এক্সপার্ট মোট কথা আপনি যে বিষয়ে দক্ষ সে বিষয়ে লেখালেখি শুরু করুন। আপনি আপনার ভিজিটরসদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠুন। আপনি যখন ভিজিটরসদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন এমন অবস্থায় আপনি আপনার সার্ভিস বিক্রি করার চিন্তা করতে পারেন। মূলত যারা প্রফেশনাল ব্লগার তারা তাদের সার্ভিস এভাবে বিক্রি করে আয় করে থাকে।

আপনার ব্লগ সাইটে ভিজিটর বাড়াবেন কিভাবে?

আপনি ব্লগ সাইট তৈরি করেছেন, কন্টেন্ট পাবলিশ করেছেন কিন্তু আপনার সাইটে ভিজিটর নাই।তাহলে ভিজিটর ছাড়া আপনি কি আপনার ব্লগ সাইট থেকে আয় করতে পারবেন? অবশ্যই না। অর্থাৎ একটি ব্লগ সাইটের প্রাণ হচ্ছে ভিজিটর, ভিজিটর ছাড়া অর্থ উপার্জনের কথা কল্পনা করা যায় না। তাহলে আপনার সাইটে আপনি ভিজিটর বাড়াবেন কিভাবে।  ওয়েব সাইটে ভিজিটর বাড়ানোর জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগুলি প্রয়োগ করতে পারেন।

কিওয়ার্ড রিসার্চঃ আপনি আপনার সাইটকে যে কিওয়ার্ড দিয়ে গুগল টপে আনতে চান সেই কিওয়ার্ড নিয়ে প্রথমে রিসার্চ করতে হবে। অর্থাৎ ঐ কিওয়ার্ড এর মাসিক সার্চ ভলিয়ুম কেমন হাই, মিডিয়াম না লো। মোট কথা সবকিছু বিচার বিশ্লেষন করে আপনাকে কিওয়ার্ড বাছাই করতে হবে। মনে করুন আপনি এমন একটি কিওয়ার্ড বাছাই করলেন যে কিওয়ার্ড লিখে কেউ কখনো গুগলে সার্চ করে না। মনে রাখবেন এরকম কিওয়ার্ড দিয়ে আপনার সাইটে কখনো ভিজিটর বাড়ানো সম্ভব না।

কম্পিটিটর অ্যানালাইসিসঃ আপনি যে কিওয়ার্ড বাছাই করেছেন সে কিওয়ার্ড এর প্রতিযোগীরা কেমন শক্তিশালী তা নিয়ে প্রথমে অ্যানালাইসিস করতে হবে। মনে করুন আপনার কিওয়ার্ড ‘বাংলা ব্লগ’ এই কিওয়ার্ড এর বিপরীতে কম্পিটিটর অনেক। এখন আপনি নতুন অবস্থায় আপনার কম্পিটিটর কে পিছনে ফেলে আপনি সহজে গুগল টপে আসতে পারবেন না।  আপনাকে অনেক পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আপনিও টপে আসতে পারবেন তবে এটি সময়ের ব্যাপার। তাই আপনার কিওয়ার্ডটি সহজে টপে আসবে কি না তা যাচাই করার জন্য কম্পিটিটর অ্যানালাইসিস করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

Search Engine Optimization বা SEO করুনঃ আপনার ব্লগ সাইটে ভিজিটর আনার জন্য কিওয়ার্ড রিসার্চ এবং কম্পিটিটর অ্যানালাইসিস এর কাজ শেষ হলে এখন আপনি SEO করুন। ব্লগ সাইটে ভিজিটর আনার জন্য SEO গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আপনার সাইটের জন্য অন পেজ এবং অফ পেজ SEO করুন। তাছাড়া বিভিন্ন সোসাল মিডিয়া প্লাটফর্মে যেমন: ফেসবুক, টুইটার, ইনস্ট্রাগ্রাম এ আপনার লেখা পোস্টগুলো নিয়মিত শেয়ার করুন।তাহলে দেখবেন খুব সহজেই আপনার ব্লগে ভিজিটর আসবে।তাছাড়া আপনার ব্লগ সাইটে ভিজিটর ধরে রাখার জন্য নিয়মিত কন্টেন্ট পাবলিশ করবেন এবং ভিজিটরকে আকৃষ্ট করার জন্য কন্টেন্ট এর মান যাতে ভাল হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন।

পরিশেষে আপনি যদি নিজেকে ভাল মানের ব্লগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন তাহলেই সফলতা পাবেন। আর এর জন্য নিজের মেধা শক্তি এবং সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে লেখার মান উন্নয়ন করতে হবে। লেখার মান উন্নয়নের জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে তবেই ভাল মানের ব্লগার হতে পারবেন।

পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার অপশন থেকে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন এবং কমেন্ট বক্সে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করবেন। আর নিয়মিত পড়তে থাকুন আপনার প্রিয় ব্লগ সাইট www.healthnbeautyblog.com এ প্রকাশিত আর্টিকেলগুলি।

About the author : Mannan570

One Comment

  1. MD.Sharifur Rahman khan September 11, 2020 at 1:30 pm - Reply

    অনেক মূল্যবান একটি লেখা …ধন্যবান

Leave A Comment